১৫ই আগষ্টের শোককে শক্তিতে রুপান্তরিত করার এক উপায় হলো ৭ ই মার্চের ভাষন

পূর্ব দিগন্তের লাল সূর্য্ সকল আধারকে দূর করে দিনের আলোকে যেমনি ভাবে আলোকিত করে । পূর্নিমার চাঁদ যেমনি ভাবে অন্ধাকারকে দূরীভূত করে রাতের আকাশ দেখার সুযোগ করে দেয়, তেমনি ১৯৭১ সালের মহান স্বধীনতা তথা মুক্তিযুদ্ধের বীজ নিহিত হয়েছিলো ।১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ তৎকালীন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহাকুমায় টুঙ্গিপাড়ার গ্রামঘেষা অজপাড়া গায়ে এক সম্ভান্ত মুসলিম পরিবারে। ১৯২০ সালের ১৭ ই মার্চ জন্ম নেয়া সেই ছোট্ট শিশু যিনি পরবর্তীতে তাঁর পরিবারে ছোট্ট খোকা। কিছুদিন পর হাটতে শেখা খোকা হয়ে উঠল বাঙ্গালি জাতির মুক্তির বার্তাবাহক ।

১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের আন্দোলন এবং ১৯৫২ সালের ভাসা অন্দোলনের এক মুক্তিকামি নাম । তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠির হাত হতে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মুক্তির জন্য তার লড়াই সংগ্রাম দিনে দিনে নতুন সপ্ন দেখাতে শুরু করল ।দেশের প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে সোচ্চার কন্ঠ … ১৯৬৬ সারে পাকিস্তানের লাহোরে ৫ই ফেব্রুয়ারী বাঙ্গালির মুক্তির সনদ তথা ৬ দফা উত্থাপন করেন । যার ফলশ্রুতিতে ১৯৬৮ সালে একটি ষড়যন্ত মামলায় তাকে জেলে যেতে হয়। এটিই তার প্রথম জেলে যাওয়া নয়। বহুবার তিনি কারাবরন করেছেনে। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী তৎকালীন “সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিসদ” তাকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করেন । পরবর্তীতে তিনি ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করেন ।কিন্তু ঐ পশ্চিম পাকিস্থানের শাসক গোষ্ঠিরা তাকে ক্ষমতার গদিতে বসতে দেয়নি। যার যার ফলশ্রুতিতে বাঙ্গালি জাতি ক্ষোভে ফুসে উঠে ও ক্ষোভ তিব্র থেকে তিব্রতর রুপ ধারণ করে । এই ঘটনার মহান নায়ক বাঙ্গালির মুক্তির বার্তাবাহক, লড়াই সংগ্রামের অগ্রনায়ক, মহান স্বধীনতার ঘোষক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হয়ে উঠল এদেশের মানুষের নতুন সপ্নের নাম । চলে আসল ১৯৭১ সালের সেই দিনটি , ১৯৭১ সালের ৭ ই মার্চ রবিবার । সেদিন সকাল থেকে বাঙ্গালি তথা হিন্দু-মুসলিম, কৃষক-শ্রমিক, চাকুরিজীবি, ব্যাবসায়ী , ছাত্র-জনতা সহ লাখো মানুষ জড়ো হতে থাকল রেস কোর্স ময়দানে। বিকাল তিনটা বিশ মিনিটে মঞ্চে আসলেন ঐ মঞ্চের শ্রেষ্ঠ কবি , কবিতার ভাষা যার মনে প্রানে গেঁথে আছে, গেঁথে আছে বাঙ্গালির মুক্তির কথা । সে দিন বাংলার আকাসে উড়েছিল বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত লাল সবুজের পতাকা । দলের কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তব্য দিচ্ছেন আর সাথে দুলছে বাঙ্গালিদের সংগ্রামের প্রতিক লক্ষ লক্ষ বাশের লাঠি। মঞ্চ থেকে মাঝে মাঝে স্লোগান তুলছেন সংগ্রাম পরিষদের নেতারা ”জয় বাংলা” আপোষ না সংগ্রাম সংগ্রাম-সংগ্রাম” আমার দেশ তোমার দেশ বাংলাদেশ-বাংলাদেশ” , বীর বাঙ্গালি অস্ত্র ধরো বাংলাদেশ স্বাধীন কর , ঘরে ঘরে দূর্গ গড় বাংলাদেশ স্বাধীন কর ।

জনগনের এই স্লোগানের সাথে সাথে জাতির পিতা তার আবেক জড়িত কন্ঠে জাতির মুক্তির জন্য সেই ঐতিহাসিক ভাষন শুরু করলেন । ভাষনে বঙ্গবন্ধু জাতীয় মুক্তির গনতান্তিক আন্দোলনকে চিরবঞ্চিত বাঙ্গালির সংগ্রামের গনতান্তিক অধিকার হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন এবং বলেছিলেন আমি শুধু বাংলার নয় পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা হিসাবে তাকে অনুরোধ করলাম ১৫ই ফেব্রুয়ারী তারিখে আপনি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন দেন । তিনি আমার কথা রাখলেন না। তিনি রাখলেন ভূট্টো সাহেবের কথা।“ আমরা পাকিস্তানের সংখ্যা গরিষ্ঠ, আমরা বাঙ্গালিরা যখনই ক্ষমতায় যাবার চেষ্টা করেছি তখনই তারা আমাদের উপর ঝাপিয়ে পড়েছে । গনতন্ত্র ও শান্তিপূর্ন সংগ্রামের প্রত্যয় ব্যাক্ত করেই বঙ্গবন্ধু ডাক দিয়েছিলেন সম্ভাব্য সশস্ত্র আঘাত মোকাবিলায় উপযুক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলয় । অসাধারন প্রজ্ঞার পরিচয় মেলে এ ভাষনে । যার ফলে বাংলাদেশ মুক্তি-সংগ্রামের, স্নায়ুযুদ্ধ-পীড়িত বিশ্বে কোনে এক পক্ষের সংগ্রাম না হয়ে অর্জন করে সার্বজনীন সমার্থন পায়। ফলে সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষ বাংলাদেশের পক্ষে ছিল সোচ্চার , আর এর প্রভাবে বিভিন্ন দেশের সরকারে ওপর চাপ পরেছিল। তিনি বক্তৃতা শুরু করেছিরেন বাঙ্গালিদের একান্ত ও নিজস্ব উচ্চারন “ ভাইয়েরা আমার বলে”। একেবারে আড়ম্বরহীন ও বাহুল্যতা ছাড়া লাখো জনতার সামনে এমন অন্তরঙ্গ, প্রায় ব্যাক্তিগত সম্বোধন বঙ্গবন্ধুর পক্ষেই সম্ভব ছিল । ভাষনের শুরুতেই তিনি বাঙ্গালির আবেগ উসকে দিয়ে অনুভূতি প্রকাশ করেছিলেন, “ আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি”। “ আজ ঢাকা চট্টগ্রাম খুলনা রাজশাহী, রংপুরে আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রন্জিত হয়েছে। আজ বাংলার মানুস মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়।” তিনি যেন বুক ভরাভালবাসা ও বেদনা নিয়ে তিনি বলেছেন , “ ৭ জুন আমার ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। আমার পয়সা দিয়ে যে অস্ত্র কিনেছি বহিঃশত্রুর হাত থেকে দেশ কে রক্ষা করার জন্য আজ সেই অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে আমার দেশের গরবি, দুখী,আর্ত মানুষের মধ্যে তাদের বুকের উপর হচ্ছে গুলি। কার সাথে বসব , যারা আমার মানুসের বুকের রক্ত নিয়েছে তাদের সংঙ্গে বসব?গরীবের যাতে কষ্ঠ না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে । আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়। মানুষকে হত্যা প্রসংঙ্গে এবং সেই কথা বলতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নএসব ঘটনাকে চিহ্নিত করেছেন আমার লোক আমার মানুষকে হত্যা হিসাবে।এভাবে বারংবার তিনি আমার দেশের গরীব-দুঃখি , আমার লোক বলে যা মানুষের মনে বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাদের ভালবাসা ও অবেগকে উদ্দীপ্ত করেছিল। তিনি তার সেই ঐতিহাসিক ভাষনে পাকিস্থানের তেইশ বছরের নিপীড়নমূলক শাসন এবং তাঁর বিরুদ্ধে জনসংগ্রামের ইতিহাস নির্যাস একটি বাক্য তুলে ধরতেও ভুরে যাননি। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন “ বাংলার ইতিহাস এদেশের মানুষের বুকের রক্ত দিয়ে রাজপথ রন্জিত করার ইতিহাস।” তাঁর এই উচ্চরনে প্রতিটি বাঙ্গালির শিরায় শিরায় রক্ত তখন প্রবাহি হতে থাকে আর বাংলার আকাশ বাতাস হয়ে ওঠে প্রতিবাদের সূর। তিনি তাঁর ভাষনে বাঙ্গারিকে একান্ত আপন তুমি সম্বোধন করেছেন। তিনি বাঙ্গালিদেরকে এই বলে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, “ মনে রাখবা রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দিবো, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশআল্লাহ।” এই অঙ্গিকারের পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু যে যৌক্তিক কথাটি উচ্চারন করেন এবং যে কথাটি বাঙ্গালির শিরায় শিরায় মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল সেটি হচ্ছে, “ এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”বাঙ্গালিদের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর বা পাক শাসক-শোসক গোষ্ঠির অত্যাচার-নির্যাতনের প্রতিক্রিয়ায় বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন “ আর যদি একটা গুলি চলে তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলে, তোমাদের যা কিছু আছে তা নিয়েই মোকাবেলা করতে হবে।” রাস্তাঘাটসহ সবকিছু বন্ধ করে দিয়ে শত্রুকে ভাতেও পানিতে মারার নির্দেশ দেন। ভাষনের একপর্যায়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন যে, সামরিক আইন তুলে নিলে, সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে নিলে হত্যার তদন্ত করলে এবং জনগনের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করলেই তিনি সংসদে বসতে পারবেন কি পারবেন না, তা বিবেচনা করে দেখবেন।

15th August Banabandhu

পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠি যেন তাকে কোন অপবাদ দিতে না পারে সে জন্য তিনি বলেছিলেন, “ আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাইনা , আমরা এদেশের মানুষের অধিকার চাই।” বঙ্গবন্ধু বাঙ্গালি জাতির স্বাধীনতা ও সার্বোভৌম রক্ষা যে অবধারিত এবং তিনি এর উপর ভিত্তি করেই তার দূরদর্শীতার প্রমান দিয়েছিলেন, “ আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি তোমরা জিবনের তরে রাস্তাঘাট যা আছে তা বন্ধ করে দিবে।” জাতির পিতা বঙ্গবন্ধ শেখ মুজিবুর রহমান তাের এই ভাষনের মাধ্যমে সমগ্র জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনের জন্য উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তিসি অধিকার আদায়ে সবাইকে কাধে কাধ রেখে লড়াই সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেনে। মার্চ -মাস বাঙ্গালির জন্য যেমনি ইতিহাস ঐতিহ্যের তেমনি মর্চ-মাস বাঙ্গালি জাতির জন্য সুখের ও আনন্দের । হয়ত ৭ ই মার্চ নাহলে এই স্বধীন সার্বভৌম একটি ভূ-খন্ড পেতাম না। কোটি মানুষের স্পন্দন ভালবাসা ও ভাল লাগার নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৫ই আগষ্ট বেইমান কিছু ঘাতকের বুলেটের আঘাতে তাকে হত্যা করা হলেও বাঙ্গালী ৭ই মার্চের ভাষনের মধ্যে যে শক্তি খুজে পায় তা হলো ১৫ ই আগষ্টের শোক থেকে মুক্তি।

জয় বাংলা।

লিখেছেনঃ

ইউনুস সিকদার

কেন্দ্রীয় সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র আন্দোলন

Leave a Reply