হত্যার অভিযোগকারী নিজেই যখন আসামী- এক লোমহর্ষক কাহিনী

সত্তরোর্ধ্ব এক বৃদ্ধ সন্ধ্যার পর রাতের আধার ভেঙ্গে গাড়ির হেডলাইটের আলোয় দৌঁড়াচ্ছে আর খুঁজছে তার মেয়েকে। রাস্তা দিয়ে চলাচলরত অনেকে দেখছে এ দৃশ্য। কেউ বৃদ্ধের কান্নার ক্ষীণ আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে না বা শুনতে পেলেও এড়িয়ে যাচ্ছে। একসময় রাস্তার পাশে বসে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। তার মেয়ে আর সে উঠেছিলো একটি বাসে। তাকে মারপিট করে চলন্ত গাড়ি থেকে ফেলে দিয়েছে রাস্তায়। আহত হয়েও বৃদ্ধ কিছুদুর গিয়েছিলেন গাড়ির পিছু। এরপর আর পারেনি গাড়ির ইঞ্জিনের গতির সাথে। চোখের নিমিষেই আধারে মিলিয়ে গেছে গাড়িটি। এবার কেউ এগিয়ে এসেছে তার কান্নার কারণ জানতে। বললেন সব কিছু। তারপর শুনে চলে গেলেন। তবে যেতে যেতে ফোন দিলেন জাতীয় জরুরী সেবা ৯৯৯ এ।

অল্প সময়ের মধ্যেই এসেছে পুলিশ। জড়ো হয়েছে কিছু পথচারী। মেয়ে হারানো বৃদ্ধ কান্নার জল মিশিয়ে বললেন তার মেয়ে হারানোর কথা। জানেনা বাসের রেজিস্ট্রেশন নম্বর কিম্বা রুটের বা গাড়ির নাম। তার নাতি জামাই নুর ইসলাম তাদেরকে একটি টাঙ্গাইল যাওয়ার বাসে তুলে দেন। যাবেন তিনি সিরাজগঞ্জ। এরপর বাসটি বিভিন্ন রাস্তায় ঘুরে তাকে মারপিট করে ফেলে দেয় আশুলিয়া ব্রীজের পাশে। বৃদ্ধকে পুলিশ গাড়িতে তুলে বাসটি খুঁজতে যায় চন্দ্রার দিকে। তবে সময় গড়িয়েছে বেশ, বাসটি গিয়েছে দুরে কোথাও। অনেক খোঁজ করেও বাসটি পাওয়া না গেলেও পাওয়া যায় বৃদ্ধের মেয়ে জরিনা খাতুন (৪৫) কে। তবে জরিনা বেগম কথা বলতে পারেনা, রাস্তার পাশে পড়ে আছে তার নিথর মরদেহ।

খবর পেয়ে ছুটে আসে ভিকটিম জরিনার মেয়ে রোজিনা খাতুন, জামাই নুর ইসলাম, বিয়ের ঘটক স্বপন ও অন্যরা। । সকলের চোখেই স্বজন হারানো কান্নার জল, হাহাকারে আকাশ বাতাস হয়েছে ভারী। পুলিশ তার নিয়মিত কাজ সুরতহাল রিপোর্ট করেছে তৈরী। এবার মরদেহ নিতে হবে থানায়, দিতে হবে মামলা। মেয়ের জামাই নুর ইসলাম নিজেই মামলার অভিযোগ করেন। পরেরদিন নিহত জরিনা বেগমের লাশের ময়না তদন্ত সম্পন্ন হলে লাশ নিয়ে চলে যান সিরাজগঞ্জে।

ঘটনা ৯ নভেম্বর রাতে, আশুলিয়া থানা থেকে ১০ নভেম্বর মামলাটি হস্তান্তর হয় ঢাকা জেলা ডিবি পুলিশের নিকট। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের নির্দেশে ১১ নভেম্বর গুরুত্ব বিবেচনায় মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে ঢাকা জেলা পিবিআই। ক্লু-লেস এই হত্যাকান্ডে দক্ষ পুলিশ অফিসারদের মেধা আর কৌশল অবলম্বন করেন সবটুকু। প্রথমেই মামলার ভিকটিম জরিনা খাতুনের বাবা আকবর আলী মন্ডলের দেয়া তথ্য এবং অভিযোগকারী নুর ইসলামের বক্তব্যে পাওয়া যায় অনেক গরমিল। দুজনেই তাদের বক্তব্য প্রদান করেন আলাদাভাবে। এবার নেয়া হয় তথ্য প্রযুক্তির সহায়তা। নুর ইসলামের ফোনের কললিস্টে বের হয়ে আসে তার অসত্য তথ্যের প্রমাণ। এবার তদন্তকারী দলের চোখ ভিন্ন দিকে। মোবাইলের কললিস্ট পর্যালোচনায় বেরিয়ে আসে থলের বেড়াল। উদঘাটন হয় ঘটনার মূল রহস্য।

মামলার অভিযোগকারীর সহিত ঘটনার আগে, সময়ে ও পরে যোগাযোগ করা ফোন নম্বর সমূহের তথ্য নিয়ে জানা যায় কয়েক ব্যক্তি ঘটনার পর থেকে বাড়ি ছাড়া। সন্দেহের তীর এবার তাদের দিকে। তারা সবাই বাস পরিচালনার সাথে সম্পৃক্ত। কেউ বাস চালক, কেউ হেলপার কেউ বাসের কন্ডাক্টর। তাদের বাসটিও সনাক্ত করে চৌকশ পুলিশ। এবার আর অপেক্ষা নয়, নজরদারী চলে অভিযোগকারী নুর ইসলামের প্রতি। তাকে পিবিআই অফিসে ডেকে এনে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে স্বীকার করে ঘটনার পরিকল্পনা ও জড়িতদের নাম পরিচয়। এবার গ্রেফতার হয় ভিকটিম জরিনার শাশুড়ি আমেনা বেগম ও বিয়ের ঘটক স্বপন।

পাঁচ বছর আগে ঘটক স্বপনের মধ্যস্থতায় সিরাজগঞ্জের রোজিনা খাতুনের বিয়ে হয় আশুলিয়ার গাজীরচটের নুর ইসলামের সাথে। বিয়ের পর থেকেই তাদের মধ্যে বিভিন্ন সময় ঝগড়া বিবাদ হয়। মাঝে মাঝেই নুর ইসলাম মারপিট করে রোজিনাকে। খবর পেয়ে রোজিনার মা জরিনা বেগম ছুটে আসে এবং সমাধান করেন। কিন্তু নুর ইসলাম ও তার মা আমেনা বেগম দোষারোপ করে রোজিনার মা জরিনার বেগমকে। নুর ইসলাম বিষয়টি জানায় ঘটক স্বপনকে। নুর ইসলাম, তার মা আমেনা ও স্বপন মিলে করে পরিকল্পনা। নুর ইসলামকে দশ হাজার টাকা দিতে বলে স্বপন। পরিকল্পনা অনুযায়ী জরিনাকে মারপিট করে নুর ইসলাম। বাবা আকবর মন্ডলকে নিয়ে ৯ নভেম্বর দুপুরে গাজীরচট আসেন জরিনা বেগম। এরপর বিকেল পাঁচটায় জরিনা বেগম ও আকবর আলীকে আগে থেকেই ভাড়া করা বাসে গাজীরচট থেকে তুলে দেয় নুর ইসলাম। চালক, হেলপার ও দুইজন কন্ডাক্টর ছাড়া বাসটিতে ছিলো না কোন যাত্রী। বিভিন্ন রাস্তায় ঘুরে সময় ক্ষেপন করে রাত সাড়ে সাতটায় আকবর আলীকে আশুলিয়া ব্রীজের কাছে মারপিট করে ফেলে দেয় তারা। ৫০০ গজ দুরে মহাসড়কের পাশে মরাগাঙ এলাকায় জরিনা বেগমকে হত্যা করে ফেলে দেয় লাশ।

পরিকল্পনাকারীরা পড়েছে ধরা, এবার হত্যাকারীদের সন্ধানে পুলিশ। চৌকশ তদন্তকারী দল ঠিকই বের করবে খুনিদের। পারবেনা জরিনা বেগমকে বাঁচাতে তবে তার খুনের বিচার করতে জড়িতদের সমর্পণ করবে বিজ্ঞ আদালতে। পুলিশের এ তদন্তকারী দলকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন অনেকে। এমন খুনের ঘটনা আর যাতে না ঘটে তার জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক অপরাধীদের। পিবিআইকে ধন্যবাদ। বাংলাদেশ পুলিশ আপনার পাশে থাকবে সবসময়।

Source: Bangladesh Police Official FB Page

Check Also

ফেসবুকে বা মোবাইলে হয়রানির শিকার

ফেসবুকে বা মোবাইলে হয়রানির শিকার হলে কী করবেন

ফেসবুকে বা মোবাইলে হয়রানির শিকার হলে কী করবেন !! বাংলাদেশ পুলিশ PHQ MEDIA, 24 OCT/2018 …

Leave a Reply