তহবিল সঙ্কট-রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ভবিষ্যত হুমকিতে

কক্সবাজার, ৯ অক্টোবর ২০১৮: জাতিসংঘের এক শীর্ষ কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন যে, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জেলা কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পরিমাণ আশানুরূপ নয়। “সঙ্কট মোকাবেলায় অর্থের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ে তদবির করা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোহিঙ্গাদের জন্য পরিচালিত মানবিক সহযোগিতা কার্যক্রম এখন পর্যন্ত সাফল্য লাভ করলেও এজন্য চাহিদামাফিক অর্থের যোগানের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কম,” মন্তব্য করেন রোহিঙ্গা রেসপন্স কর্মসূচির প্রধান ও ইন্টার সেক্টর কোঅর্ডিনেশন গ্রপ (আইএসসিজি)-এর ভারপ্রাপ্ত সিনিয়র কোঅর্ডিনেটর আনিকা স্যান্ডলান্ড।

তহবিল সঙ্কট রোহিঙ্গা শরণার্থী

আজ মঙ্গলবার বাংলাদেশে বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের উচ্চ পর্যায়ের কূটনীতিকদের একটি দলের সফরসঙ্গী হিসেবে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনের পর তিনি এসব মন্তব্য করেন। প্রায় দশ লাখ শরণার্থীর সমস্যাগুলো সম্পর্কে সরাসরি জানতে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ডেনমার্ক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেন। সামনেই ঘূর্ণিঝড় মৌসুম এবং শরণার্থী শিবিরগুলোতে এর বিধ্বংসী প্রভাব পড়তে পারে। শরণার্থীরা এমনিতেই তাদের ভবিষ্যত নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন। ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্যতা তাদের আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেবে।”

কূটনীতিকদের যৌথ এই দলটি স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গসংস্থার প্রধান এবং রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাত করেন। যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় (জেআরপি) চাওয়া অর্থের মাত্র ৩৯ শতাংশ এপর্যন্ত পাওয়া গেছে। অথচ চলতি বছরের শেষনাগাদ রোহিঙ্গা শরণার্থী ও ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জরুরি চাহিদা পূরণে আরও ৫৭৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন হবে। অত্যন্ত জরুরি কর্মসূচিগুলোর জন্য প্রাপ্ত অর্থের যোগান ফুরিয়ে যাবে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এর ফলে জীবন রক্ষায় অপরিহার্য সব পরিষেবা কার্যক্রম পরিচালনা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে। জরুরি এই তহবিল না থাকলে ইতিমধ্যে ঝুঁকির মধ্যে থাকা এই জনগোষ্ঠীর, যাদের ৮০ শতাংশই নারী ও শিশু, স্বাস্থ্য ও সুস্থতার সাথে আপোস করতে হবে।

রোহিঙ্গা শরণার্থীরা মানবিক সহায়তার উপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল। এর মধ্যে আট লাখ ৬০ হাজার শরণার্থীকে প্রতি মাসে খাদ্য সাহায্যের উপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হয়। ২০১৯ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনও ছয় কোটি ৬০ লাখ ডলার প্রয়োজন। শরণার্থী শিবিরগুলো এতোটাই ঘিঞ্জি যে বর্তমানে ভূমিধস ও বন্যার ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলোতে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে স্থানান্তর করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বেশিরভাগ আশ্রয়স্থল পাহাড়ের ঢালে ও বালুপূর্ণ এলাকায় তাড়াহুড়ো করে বানানো হয়েছে। এসব এলাকা ভূমিধস ও বন্যার আশঙ্কাযুক্ত। তাছাড়া ঘণবসতিপূর্ণ হওয়ায় শরণার্থীদের সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্য, পানি ও পয়োঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

শিবিরগুলোতে মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থার অভাব এক বিশাল সমস্যা। প্রাক প্রাথমিক ও প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা পাওয়ার উপযোগী প্রায় ৫৫ শতাংশ এবং ৯৮ শতাংশ কিশোর-কিশোরী এখনও মানসম্মত শিক্ষার আওতার বাইরে রয়ে গেছে। “বর্তমানে বিশ্বের অনেক অঞ্চলে শরণার্থী সঙ্কট দীর্ঘয়িত হচ্ছে। এরপরও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রশ্নে সামনে অগ্রসর হতেই হবে,” বলেন আনিকা স্যান্ডলান্ড। “আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে রোহিঙ্গাদের জন্য সাড়াদান কর্মসূচির ক্ষেত্রে সুরক্ষার বিষয়টি যেন সুনিশ্চিত হয়। এবং অত্যন্ত ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের (যেমন লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতার শিকার, বয়স্ক ও দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকা ব্যক্তি) উপর নজর রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ যাতে আমাদের হাতে থাকে সে বিষয়টিও নিশ্চিত করা যায়।”

জাতিসংঘ কর্মকর্তারা বলছেন, শরণার্থীদের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সমর্থন দেয়াও জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ, এরাই শরণার্থীদের জন্য নিজেদের ঘরের দরজা খুলে দেয়ার পাশাপাশি তাদের সামান্য সম্পদও ভাগ করে নিয়েছিলেন। ভূমি ও পানির মতো প্রাকৃতিক সম্পদের পরিমাণও ক্রমশ কমে আসছে। পরিবেশগত উদ্বেগ মোকাবেলায় মানবিক সহায়তা প্রদানকারী সংস্থাগুলো বর্তমানে বেশ কয়েকটি প্রকল্প পরিচালনা করছে। এগুলোতে শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। উল্লেখ্য, যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনার আওতায় লক্ষিত জনগোষ্ঠীর প্রায় এক-চতুর্থাংশ স্থানীয় জনগোষ্ঠী।

জাতিসংঘ ও ত্রাণ সংস্থাগুলো মনে করে, শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই ও সম্পদের উপযোগী ব্যবহার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারকে দীর্ঘমেয়াদী সহায়তা দেয়া প্রয়োজন।সেইসাথে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অবিলম্বে নিরাপদ, স্বেচ্ছাপ্রণোদিত ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে মিয়ানমারের উপর জরুরিভিত্তিতে চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে।

আরও তথ্যের জন্য যোগাযোগ করুন:
নায়ানা বোস, কমিউনিকেশনস অফিসার, আইএসসিজি communications1@iscgcxb.org
সালমা রহমান, ন্যাশনাল কমিউনিকেশনস অফিসার, আইএসসিজি communications2@iscgcxb.org

Check Also

শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে মেয়র আতিকুল

শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে চলে গেলেন মেয়র আতিকুল

রাজধানীর নর্দ্দায় বাসচাপায় বিইউপি শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরীর মৃত্যুর পর সড়ক অবরোধ করেছেন তার সহপাঠিরা। …

Leave a Reply