ডাকসু নির্বাচন-আতুড়ঘরে আলোর সম্ভাবনা

ভাষা আন্দোলন, মহান স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ঐতিহ্য ধারনকারী প্রাচ্যের অক্সর্ফোড খ্যাত বিদ্যাপিঠ তারুন্যের গণতন্ত্র চর্যার সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়্।দেশের জাতীয় নেতৃত্ব তৈরির আতুড়ঘর ডাকসু। সেই সংগঠনের নির্বাচন না হওয়া মানে ভবিষ্যতে যোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্ব তৈরির পথ অনেকটাই বন্ধ হয়ে যাওয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রানকেন্দ্র ডাকসু।

ডাকসু নির্বাচন 2019

দীর্ঘ ২৮ বছর বন্ধ থাকার পর ডাকসু নির্বাচন উদ্যেগ গ্রহন করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য্, প্রো-উপাচার্য্, প্রোক্টরসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। বিদ্যমান ডাকসু গঠনন্ত্র যুগোপযোগী সংস্কার ও পরিবর্তন এখন কিছুটা সময়ের দাবী।দেশের স্বাধিকার, ভাষার সংগ্রাম ও স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম সূতিকাগার ডাকসু। বাঙ্গালীর স্বাধীকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের আশার প্রদীপ হয়ে জ্বলে উঠেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। দেশকে নেতৃত্ব তৈরীর আতুঘর এটি।ছাত্রদের অধিকার প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার ও এই ডাকসু।১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ১৯২২-১৯২৩ সালে শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাসু) ।বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সেতু বন্ধনের এক মাধ্যমও ডাকসু।

যদি আমি এক কথায় বর্ণনা করি তবে বলতে পারি যে, ডাকসু হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোর ঝর্ণাধারা, অন্ধকার দূর করার প্রদীপ।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর সব থেকে দীর্ঘ বিরতি পর হতে যাচ্ছে ডাকসু নির্বাচন। সর্বশেষ ১৯৯০ সালের ৬ জুন অনুষ্ঠিত হয় ডাকসু নির্বাচন।১৯৯১ সালের ৬ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিসি অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিঞা নির্বাচনের তফসিল ঘোষনা করেছিলেন, তখন ছাত্রনেতাদের বিশেষ ভর্তি সম্পর্কিত কারনে বন্ধ হয়ে যায় ডাকসু নির্বাচন।এর পর ডাকসু নির্বাচনের জন্য কয়েকবার উদ্যেগ গ্রহন করা হলেও কোন উদ্যামী উদ্যেগ দেখা যায়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ভিসি দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই ডাকসু নির্বাচনের জন্য কিছুটা উদ্যেগ গ্রহন করেন।এবং মহমান্য কোটের একটি রিট ডাকসু নির্বাচনের জন্য মার্চ ২০১৯ বেধে দেয়ে । এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ডাকসু নির্বাচন করার জন্য বর্তমান প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনের সাথে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করেন, যেখানে সকল ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্ধ উপস্থিত ছিল।সর্বশেষ ১০ জানুয়ারী ২০১৯ বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃবৃন্দদের নিয়ে আরো একটি আলোচনা সভার আয়োজন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন।১৯৫৩ সালে গঠনতন্ত্র সংশোধনের মাধ্যমে নাম পরিবর্তন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) রাখা হয়।

প্রথমদিকে ডাকসুর ভিপি মনোনীত করা হত, ১৯২৪-২৫ সালে প্রথম ডাকসুর ভিপি মনোনীত করা হয়।তখন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের এক টাকা চাঁদা দিয়ে এর সদস্য হতে হতো। মোট ৩৬ বার এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ডাকসুর প্রথম ভিপি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন যথাক্রমে মমতাজ উদ্দিন আহমেদ ও যোগেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত। ১৯৫৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ডাকসুর প্রথম নিবার্চন অনুষ্ঠিত হয়। উপাচার্যকে সভাপতি এবং ১৬ জন ছাত্র প্রতিনিধি থেকে ১০ জন কর্মকর্তা নির্বাচনের ব্যবস্থা রাখা হয়, কোষাধাক্ষের দায়িত্ব পালন করেন একজন শিক্ষক।১৯৭০ সালে ডাকসুতে পরোক্ষ নির্বাচনের বদলে প্রত্যক্ষ নির্বাচন পদ্ধতি চালু হয়। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে ডাকসু, স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ, ছাত্রলীগসহ অন্যান্য ছাত্রসংগঠনের অবদান অবিস্মরণীয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ডাকসুর ভিপি হিসেবে নির্বাচিত হন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন থেকে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এবং জিএস নির্বাচিত হন মাহবুবুর জামান সর্বশেষ ১৯৯০-৯১ সেশনের জন্য ভিপি ও জিএস পদে যথাক্রমে নির্বাচিত হন ছাত্রদলের আমানউল্লাহ আমান ও খায়রুল কবির খোকন।১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ডাকসু এক গৌরবোজ্বল ভূমিকা পালন করে। ডাকসুর নেতৃবৃন্দের সাহসী ও বলিষ্ঠ উদ্যোগে ১৯৭১ সালের ২রা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বটতলায় প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন তত্কালীন ডাকসু ভিপি আ স ম আব্দুর রব।

বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টিকারী ও শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় নির্দলীয় মঞ্চ ডাকসু। প্রায় দুই যুগের বেশি সময় পর শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক দাবির প্রেক্ষিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের যে প্রক্রিয়া সেটা সারা বাংলার ছাত্র সমাজের কাছে এক আনন্দঘন উত্সবের আমেজে পরিনত হয়েছে।১৯৯০ সালে দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরুর পর দ্বিতীয় বারের মত হতে যাচ্ছে ডাকসু নির্বাচন।ডাকসু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এদেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বন্ধ থাকা ছাত্র সংসদ আবার আপন শক্তিতে জ্বলে উঠার আশার আলো দেখছেন ।বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ ১৯৭৩ অনুযায়ী সিনেটের ১০৪ সদস্যের মধ্যে ৫ জন থাকবে ছাত্র প্রতিনিধি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরামে ছাত্র স্বার্থ সংরক্ষণে ভূমিকা পালন করতেন এই ছাত্র প্রতিনিধিরাই।

ডাকসু নির্বাচন নেই বলে এই নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিও নেই। ফলে ছাত্রদের অনেক দাবি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অজানাই থেকে যাচ্ছে, আবার অনেক দাবি বাস্তবায়ন গুরুত্ব বা অগ্রাধিকার পাচ্ছে না। শিক্ষার্থীদের অনেক দাবি দীর্ঘদিন ধরে অবাস্তবায়িত। তারা ছাত্রসংগঠনগুলোর কর্মসূচিতে অংশ গ্রহণ করলেও তাদের দাবী পূরন করতে ব্যর্থ বর্তমান ছাত্র সংগঠনগুলো।এর ফলে ক্যাম্পাসের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিও সন্তোষজনক নয়। কিন্তু নির্বাচিত ও সর্বজনীন ছাত্রনেতৃত্ব না থাকায় সেগুলো ঠিকভাবে কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে না। সঠিক নেতৃত্ব গড়ে উঠছে না। তাই যত দ্রুত ছাত্র সংসদ নির্বাচন হবে সবার জন্য ততটাই মঙ্গল।

জয় বাংলা, জয় হোক মেহনতি মানুষের।

লেখক
ইউনুস সিকদার
সভাপতি
বাংলাদেশ ছাত্র আন্দোলন, কেন্দ্রীয় কমিটি
সিনিয়র সদস্য, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ
সাবেক সভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Check Also

শেখ হাসিনা

আমার ভোট আমি দেবো, শেখ হাসিনা ছাড়া কাকে দোবো?

শিরোনাম দেখে যেকেউ নেগেটিভ ভাবতে পারেন। না এ সুযোগ নেই। এটি শেখ হাসিনার নির্বাচনী এলাকা …

Leave a Reply